আমাদের এই সুবিশাল মহাবিশ্বে রয়েছে অসংখ্য রহস্যময় গ্রহ, নক্ষত্র এবং শূন্যস্থান বা স্পেস। স্থান ও পরিবেশভেদে এই মহাবিশ্বে কোন জায়গা অতন্ত উষ্ণ আবার কোন জায়গা আছে প্রচণ্ড শীতল । রহস্য এবং বৈচিত্র্যে ঘেরা এই মহাবিশ্বে এমন অনেক গ্রহ বা নক্ষত্র আছে যারা আজও আবিষ্কারের অপেক্ষায় রয়েছে, তবে আজ আমরা আমাদের জানার ভিতরে মহাবিশ্বের শীতলতম স্থানটি সম্পর্কে জানব।
1983 সালের জুলাই মাসে অ্যান্টার্কটিকায় অবস্থিত রাশিয়ান গবেষণা কেন্দ্র ভোস্টক বেসে আমাদের পৃথিবীতে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল এবং সেটি ছিল -89'2 ° সে। পরবর্তীতে , 2014 থেকে 2016 সালের মধ্যে স্যাটেলাইট ব্যবহার করে একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে যে পৃথিবীর সবচেয়ে শীতল জায়গা হচ্ছে অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশের পূর্ব অ্যান্টার্কটিক মালভূমি। সেখানকার গড় তাপমাত্রা মাইনাস ৯৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তবে যদি আমরা মহাবিশ্বের সবচেয়ে অমানবিক কোণগুলির মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু করি, তাহলে আমরা অনেক ঠান্ডা জায়গা খুঁজে পাব। কিন্তু সত্য হল তাপগতিবিদ্যার নিয়ম অনুসারে একটি চরম তাপমাত্রা রেয়েছে আর এই তত্ত মতে এর থেকে কম তাপমাত্রা হওয়া কখনই সম্ভব নয়। আর সেটি হল -273'15 ºC। তাই আপনি একটি নক্ষত্রের তাপ থেকে যতই দূরে থাকুক না কেন, -273'15 ºC এর চেয়ে বেশি ঠান্ডা জায়গা কখনই খুজে পাবেন না।
মহাবিশ্বের তাপের প্রধান উৎস হল নক্ষত্র। নক্ষত্র ও এর আশেপাশের কিছু অঞ্চল ছাড়া পুরো মহাবিশ্বই ভয়ংকর শীতল। আর এই শীতল স্থানের মধ্যও রয়েছে শীতলতম স্থান। বিজ্ঞানীদের জানামতে এখন পর্যন্ত মহাবিশ্বের সবচেয়ে শীতলতম জায়গাটির অবস্থান বুমেরাং নেবুলাতে। পৃথিবী থেকে প্রায় ৫ হাজার আলোকবর্ষ দূরে এই নেবুলা অবস্থিত ।
বুমেরাং নেবুলা হল ধূলিকণা এবং আয়নিত গ্যাসের প্রতিফলিত মেঘ। এটি একটি তরুণ গ্রহের নীহারিকা যার কেন্দ্রে একটি মৃতপ্রায় লাল দৈত্যাকার তারা রয়েছে। কোটি কোটি বছর আগে এই বুমেরাং নেবুলা আমাদের সূর্যের মতো একটি উত্তপ্ত নক্ষত্র ছিল। এটি তার জীবনের শেষ পর্যায়ে রয়েছে এবং বাইরের স্তরগুলিকে ফেলে দিচ্ছে। কিন্তু এটি অন্যান্য মৃত নক্ষত্রের তুলনায় প্রায় 100 গুণ দ্রুত তার ভর হারাতে দেখা গিয়েছে । তাই এই বুমেরাং নেবুলা অন্যান্য নক্ষত্র থেকে অনেকটাই আলাদা।
বুমেরাং নেবুলার গভীর অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা হল দাঁত-কাঁপানো -458 ডিগ্রি ফারেনহাইট বা -272 ডিগ্রি সেলসিয়াস, যার অর্থ হল বুমেরাং নেবুলা পরম শূন্য তাপমাত্রা থেকে মাত্র এক ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি । এটি 2010 সালে, অ্যান্টার্কটিকার জুড়ে রেকর্ড করা তাপমাত্রা -199.8 ডিগ্রি ফারেনহাইট বা -93.2 ডিগ্রি সেলসিয়াসের চেয়ে তিনগুণ বেশি ঠান্ডা।
বুমেরাং নেবুলা এতই ঠান্ডা যে এটি মহাজাগতিক মাইক্রোওয়েভ পটভূমির বা CMB তাপমাত্রা বিগ ব্যাং থেকে অবশিষ্ট তাপমাত্রার চেয়েও কম। প্রকৃতপক্ষে, CMB-এর আলো বুমেরাং নীহারিকা দ্বারা শোষিত হয়।
এই স্থানটির ব্যাসার্ধ ১ আলোকবর্ষ। যারা আলোকবর্ষ সম্পর্কে জানেন না তাদের একটু সহজ করে দেই। আলো ১ বছরে যে পরিমান দূরত্ব অতিক্রম করে তা হল ১ আলোকবর্ষ। আর দূরতের হিসাবে এক আলোক বর্ষ সমান ৯.৪৬ ট্রিলিয়ন কিলোমিটার বা ৫.৮৮ ট্রিলিয়ন মাইল।
এই নেবুলাটি Planetary Nebula দিকে বিকশিত হওয়ার কারনে এটিকে একটি তারকা সিস্টেমের মত ধারনা করা হয়। এটি এখনো গ্যাসের বহিঃপ্রবাহের কারনে গঠিত হচ্ছে আর এর কেন্দ্রের যেই তারাটি অবস্থান করছে তার জীবদ্দশা এবং ভর একদম শেষ পর্যায়ে। নেবুলাটির মধ্যে এক ধরণের ধুলো নির্গত করে থাকে যা নক্ষত্ত্রালোক দ্বারা প্রতিফলন ঘটায়। এই নির্গত হওয়া গ্যাসের গতি ১৬৪ কি.মি./সে এবং অত্যন্ত দ্রুতগতিতে মহাবিশ্বের বাইরে তা ছড়িয়ে পড়ছে। আর গ্যাসের এই প্রসারিত হওয়ার ঘটনাটি ঘটছে নেবুলার মধ্যে বিদ্যমান অত্যন্ত নিম্ন তাপমাত্রার কারণে।
১৯৮০ সালে “Keith Taylor এবং Mike Scarrott” “Siding Spring Observatory” থেকে “Anglo -Australian Telescope” এর সাহায্যে প্রথম পর্যবেক্ষণ করার পর একে “Boomerang Nebula” নামকরণ করেন। এই নেবুলাটি অত্যন্ত স্বচ্ছভাবে দেখা সম্ভব না কিন্তু ১৯৯৮ সালে “Hubble Space Telescope” অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বিস্তারিত তথ্যের সাথে এই নেবুলাটির ছবি তোলে। ১৯৯৫ সালে বিজ্ঞানীরা চিলিতে ১৫ মিটারের “Swedish ESO Submillimetre Telescope” ব্যবহার করে ঘোষণা করে যে এই নেবুলাটি যে স্থানে অবস্থিত সেই স্থানটি আমাদের এই মহাবিশ্বের এখন পর্যন্ত সবচেয়ে শীতলতম স্থান। এমনকি গবেষণাগারে তৈরী করা সবচেয়ে নিম্ন তাপমাত্রার চেয়েও এই স্থানটি অত্যন্ত শীতলতম।
0 মন্তব্যসমূহ