ডলারের দাম বৃদ্ধিতে যেসব প্রভাব পড়বে বাংলাদেশে

ডলারের দাম বৃদ্ধিতে যেসব প্রভাব পড়বে বাংলাদেশে

আমরা অনেকেই খেয়াল করেছি যে, আমাদের দেশে হঠাৎ করে মার্কিন ডলারের মূল্যমান লাগামহীন হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশের টাকার মানের তুলনায় এক লাফে ডলারের মূল্য ১৪-১৬ টাকা পর্যন্ত বেরেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অন্যতম প্রধান বিনিময় মুদ্রা ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ার বিপরীতে বাংলাদেশের মুদ্রার ব্যাপক দরপতন ঘটেছে। এর ফলে দেশের সবকিছুতেই নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। মূলত করোনা পরবর্তী সময়ে দেশে আমদানি বেড়ে যাওয়ায় ডলারের এই সঙ্কট তৈরি হয়েছে। তাই ডলার সঙ্কট নিয়ন্ত্রণে দেশে বিলাসবহুল পণ্য আমদানি নিরুৎসাহিত কয়ারা সাথে, সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং কম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের বাস্তবায়ন পিছিয়ে দেয়ার কথাও ভাবছে সরকার। পরিস্থিতি সামাল দিতে বাংলাদেশ ব্যাংক এ পর্যন্ত ৫২১ কোটি ৬০ লাখ ডলারও বিক্রি করেছে। কিন্তু কোনো কিছুতেই ডলারের বাজারে অস্থিরতা কমানো যাচ্ছে না।

ওদিকে দেশের বাজারে প্রতিনিয়ত বাড়ছে দ্রব্যমূল্য। আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের হিসাব মেলাতে হিমশিম খাচ্ছে সাধারণ মানুষ। তারমধ্য দেশের মুদ্রাবাজার অস্থিতিশীল। মুদ্রাবাজারকে স্থিতিশীল রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক গেল দুই মাসের মধ্যে বেশ কয়েকবার  মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন করেছে। এতে আমদানি করা পণ্যের দাম বৃদ্ধির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। যার কারণে দেশের পুরো বাজারেই দ্রব্যমূল্যর প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা।

গত প্রায় দেড় দশকে, অর্থনীতি নিয়ে এত বড় চ্যালেঞ্জের মধ্যে আর কখনো পড়তে হয়নি বাংলাদেশকে। গত ২০ বছরের মধ্যে বিশ্বে ডলারের দর এখন সবচেয়ে বেশি। আর চাঙা হওয়া ডলারের প্রভাবে বিপাকে আছে ছোট অর্থনীতির দেশগুলো। আর তাই বিপদে পড়েছে বাংলাদেশও। এই সংকটে অনেক  চ্যালেঞ্জর মোকাবেলা করতে হতে পারে জনগণকে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, আন্তঃব্যাংক লেনদেনে মার্কিন ডলারের বিনিময় মান ছিল ৮৭ দশমিক ৫ টাকা। কিন্তু দেশের ইতিহাসে ৭ জুন মার্কিন ডলারের মান একদিনে সর্বোচ্চ ৯২.১৩ টাকা হয়েছিল।

বাজারেও ডলারের দাম বাড়ায় সার্বিক অর্থনীতিতে বহুমুখী প্রভাব পড়ছে। তবে এতে ইতিবাচকের চেয়ে নেতিবাচক দিকই বেশি। 

নেতিবাচক দিকগুলোর মধ্যে বৈদেশিক ঋণ ও অন্যান্য দায়দেনা বাড়বে। বৃদ্ধি পাবে আমদানি খরচ। ফলে আমদানি পণ্যের দাম বাড়বে। বেড়ে যাবে শিল্প স্থাপনের খরচ। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বিনিয়োগে। টাকার মান কমে গিয়ে হ্রাস করবে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা। পণ্যের দাম বাড়ায় এবং টাকার মান কমায় চাপ বাড়বে মূল্যস্ফীতির ওপর। যার যন্ত্রণায় ভোগবে নিম্ন, স্বল্প ও মধ্য আয়ের মানুষ।

ইতিবাচক দিকগুলো হচ্ছে, ডলারের দাম বাড়ায় বিদেশের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানিতে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। প্রবাসীরা রেমিট্যান্সের বিপরীতে দেশে আরও বেশি টাকা পাবে। ফলে তারা লাভবান হবেন।

ডলারের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় ফলে দেশের অর্থনীতিতে বহুমুখী প্রভাব পড়বে। কারণ বাংলাদেশ রফতানির তুলনায় আমদানি বেশি হয়ে থাকে। ফলে আমদানি খরচ আরও বাড়বে। দেশে যে পরিমাণ অর্থ রফতানি করে আয় হচ্ছে, তার তুলনায় পণ্য আমদানিতে বেশি অর্থ ব্যয় হবে। যার প্রভাব পড়বে দ্রব্যমূল্যে।

ইতোমধ্যে বিশ্ববাজারে অস্থির তেলের বাজার। যার প্রভাবে প্রতিনিয়তই বাড়ছে নিত্যপণ্যের দাম। প্রায় সব পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। হিসাব মেলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে স্বল্প আয়ের মানুষদের।  

এছাড়া আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় দেশের বাজারে ইতোমধ্যে চাল, ডাল, ভোজ্য ও জ্বালানি তেল সহ, শিশুখাদ্য, মসলা, গমের দাম বেড়ে গেছে। প্রতিবেশী দেশ ভারত গম রফতানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করায় দেশের বাজারে বাড়ছে গমের দাম। 

এ বিষয়ে ড. এম আবু ইউসুফ বলেন, বাংলাদেশ সরকারিভাবে গম আমদানি করতে পারলেও, যেহেতু ভারত সরকারেরও কিছু বিধিনিষেধ রয়েছে, অনেক সময় টাকা থাকা সত্ত্বেও গম আমদানি করা যাবে না। এ সুযোগেও ডলারের দাম বেড়ে গেছে। গমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব নিত্যপণ্যের দামও বেড়ে গেছে।

টাকা দিয়ে ডলার কিনে যেসব বৈদেশিক লেনদেন করা হয়, সেক্ষেত্রে গুনতে হবে বাড়তি খরচ। যেমন- শিক্ষা ব্যয় ও চিকিৎসা ব্যয়।

এছাড়া বিমানের টিকিট আর বিদেশে চিকিৎসা ব্যয়ও বেড়ে যাবে। ফলে বিদেশগামী যাত্রী ও পর্যটকদের নতুন করে সমস্যায় পড়তে হবে।

পাশাপাশি শিল্প স্থাপনে ব্যয় বাড়বে। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় পণ্য পরিবহনের ব্যয় বেড়েছে। বলাবাহুল্য যে, বেশি দামে পণ্য আমদানি হলে, তা দেশের বাজারে বেশি দামেই বিক্রি হবে। এছাড়া শিল্পের কাঁচামাল বেশি দামে আমদানি করলে পণ্যের উৎপাদন ব্যয় বাড়বে ফলে দামও বাড়বে। 

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষক বলেন, আমদানি করা পণ্য বা যেসব পণ্যের কাঁচামাল দেশের বাইরে থেকে আমদানি করা হয়, সেসব পণ্যের দাম বেড়ে যাবে।

তাই অতিসয় খোলাবাজার ও ব্যাংকে ডলারের দামের পার্থক্য কমিয়ে আনতে হবে। নয়ত, এভাবে চলতে থাকলে শ্রীলঙ্কার মত হয়ে জেতে পারে বাংলাদেশ

তবে ভাল কথা হল, রপ্তানি বাণিজ্যে ধরে রেখেছে বাংলাদেশ। এই নয় মাসে বিভিন্ন পণ্য রপ্তানি করে ৩৮ দশমিক ৬০ বিলিয়ন ডলার আয় করেছে বাংলাদেশ, যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ৩৩ দশমিক ৪১ শতাংশ বেশি। তাই এত সহজেও অর্থনৈতিক ধশ নামবে না আমাদের দেশে। 


 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ