চাঁদ শব্দটি আমাদের কাছে বেশ পরিচিত। আমরা পৃথিবীর মানুষ চাঁদ সম্পর্কিত বিভিন্ন ঘটনা শুনেছি। চন্দ্রগ্রহণ, জোয়ারভাটা, পূর্ণিমা, অমাবস্যা ইত্যাদি চাঁদ সম্পর্কিত বিষয়বস্তুগুলোর নাম আমরা সবাই জানি। এই মহাবিশ্বে চাঁদ হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে কাছের প্রতিবেশি। চাঁদ পৃথিবীর একমাত্র প্রাকৃতিক উপগ্রহ এবং আমাদের সৌর জগতের পঞ্চম বৃহত্তম উপগ্রহ।
বিভিন্ন সময়ে চাঁদ নিয়ে গবেষণার পর নানা তথ্য দিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। এছাড়া পৃথিবীর এই উপগ্রহটির সম্পর্কে শোনা যায় নানান কথা, গল্প আর কুসংস্কার। এসব গল্প গ্রহণযোগ্য না হলেও বাস্তবে এখনো মানবজাতির জন্য চাঁদ এক রহস্যময় উপগ্রহ। আর কখনও কখনও একে উপমা হিসেবে ব্যবহার করেন বিভিন্ন বয়সের রোমান্টিক লোকজন। অনেক রোমান্টিক ভাবে চাঁদের নাম দিয়েছে- ব্লু মুন, ক্রিসেন্ট মুন, ফুল মুন।
তবে চাঁদকে ঘিরে এখনও অনেক রহস্য আছে। কিভাবে হয়েছিল এই চাঁদের উৎপত্তি? চাঁদ আসলে কেমণ দেখতে? চাঁদের মধ্যে কি অক্সিজেন বা পানি আছে? এমন অনেক প্রশ্ন আছে যেগুলো আমাদের মাথায় ঘুরতে থাকে। আজ চাঁদ সম্পর্কে কিছু আজব আর বিস্ময়কর তথ্য জানব।
এই চাঁদের সৃষ্টি ও উৎপত্তি নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে কিছু মতভেদ আর তত্ব রয়েছে.
- কোনো কোনো বিজ্ঞানীদের মতে, প্রায় 300 কোটি বছর আগে পৃথিবী গ্যাসীয় অবস্থায় ছিল। তখন তার খুব কাছ দিয়ে একটা বিরাট নক্ষত্র চলে যায়। এই সময় সেই নক্ষত্রের আকর্ষণে পৃথিবীর দেহ থেকে একটি অংশ বিচ্ছিন হয়ে চাঁদের সৃষ্টি হয়েছিল।
- উইলিয়াম হার্টম্যান ও ডোনান্ড ডেভিস মহাসংঘাত তত্ব বা giant impact theory এর সাহায্যে চাঁদের উৎপত্তি ব্যাখ্যা করেন। তারা বলেন, পৃথিবীর বয়স যখন 10 কোটি বছর তখন, একটি অতিকায় গ্রহাণু ও পৃথিবীর কিছুটা অংশ বা্পে পরিণত হয়েছিল। পরে বাম্প শীতল ও ঘনীভূত হয়ে চাদের সৃষ্টি হয়।
- তবে প্রচলিত ও সরভাধিক তত্বানুযায়ী, আজ থেকে প্রায় ৪.৫ বিলিয়ন বছর আগে চাঁদের উৎপত্তি হয়েছিল। সোলার সিস্টেম গঠিত হওয়ার অল্প কিছুকাল পরে, অনেকটা মঙ্গল গ্রহের আকৃতির মত থিয়া নামক একটি শিলার সাথে পৃথিবীর সজোড়ে সংঘর্ষ হয়েছিল। এই সংঘর্ষের ধ্বংসাবশেষ থেকে চাঁদের সৃষ্টি হয়েছিল।
নাসার অ্যাপোলো -14 মিশনের সময় চাঁদ থেকে নিয়ে আসা লুনার পাথরের নমুনাগুলি অধ্যয়ন করে, বিজ্ঞানীরা অনুমান করেন যে চাঁদ প্রায় 4.5 বিলিয়ন বছর আগে সৃষ্টি হয়েছিলো। এই হিসাবে চাঁদের বয়স প্রায় 4.5 বিলিয়ন বা ৪৫০ কোটি বছর।
আমরা সবাই চাঁদকে গোল আকৃতির দেখি কিন্তু বাস্তবে চাঁদ আসলে ডিমের মতো। আপনি যখন এর দিকে তাকান তখন শুধুমাত্র এর ছোট দুই প্রান্তের কোন একটিকে দেখতে পান। চাঁদের ভরের কেন্দ্র ঠিক এর জ্যামিতিক কেন্দ্রে অবস্থিত নয়। এটি জ্যামিতিক কেন্দ্র থেকে ১ দশমিক ২ মাইল দূরে। আর এই কারনে আমরা চাঁদকে দিম্বাকার না দেখে গোলাকার দেখি।
আমরা দিনের বেলা যে সূর্য দেখি তা একটি পূর্ণ চাঁদের চেয়েও ১৪ গুণ মাত্রায় বেশি উজ্জ্বল। সূর্যের মতো সমান উজ্জ্বলতায় জ্বলতে হলে প্রায় চার লাখ পূর্ণ চাঁদের প্রয়োজন।
দুর্বল মহাকর্ষ বলের কারণে চাঁদের কোনো বায়ুমণ্ডল নেই। তাই চাঁদ মহাজাগতিক রশ্মি, উল্কাপিন্ড এবং সৌর বাতাস থেকে অসুরক্ষিত বা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এছাড়া এখানে তাপমাত্রারও অনেক তারতম্য রয়েছে। চাঁদ দিনের বেলায় অত্যন্ত গরম এবং রাতে খুব ঠান্ডা থাকে। চাঁদে দিনের গড় তাপমাত্রা 134 ° C এবং রাত্রির গড় তাপমাত্রা -153 ° C হয়ে থাকে। চন্দ্রগ্রহণের সময় চাঁদ যখন পৃথিবীর ছায়ার ভেতরে চলে যায় তখন চন্দ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা দেড় ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে ৫০০ ডিগ্রি ফারেনহাইটও কমে যেতে পারে।
যেহেতু চাঁদের কোন বায়ুমণ্ডল নেই তাই বায়ুমণ্ডলের অভাবের কারণে চাঁদে কোন শব্দ শোনা যায় না এবং আকাশ সবসময় কালো দেখায়।
আমরা কমবেশি সবাই জানি যে চাঁদের মাটিতে প্রথম মানুষের পা পড়ে ১৯৬৯ সালের ২১ জুলাই আর মানুষটি হল নীল আর্মস্ট্রং ৷ এরপর ১৯৭২ সাল পর্যন্ত তিন বছর বিভিন্ন সময় মোট ১২ জন মহাকাশচারি চাঁদের মাটিতে পায়চারি করতে সফল হয় ৷ সবক’টা অভিযানই ছিল নাসার অ্যাপোলো প্রোগ্রামের অন্তর্গত ৷
মজার ব্যাপার হল চাঁদে পা রাখা দ্বিতীয় মানুষ বাজ অলড্রিন হলেও তিনি ছিলেন প্রথম ব্যক্তি যিনি চাঁদে প্রস্রাব করেছিলেন ৷
প্রায় 1 কুইন্টাল 81 কেজি মানুষের তৈরি জিনিসপত্র বা ধ্বংসাবশেষ চাঁদের পৃষ্ঠে পড়ে আছে। এই ধ্বংসাবশেষ এর মধ্যে 70 টিরও বেশি মহাকাশযান এবং ক্র্যাশ করা কৃত্রিম উপগ্রহ আছে।
এই সব তথ্যের মধ্যেও বিস্ময়কর কথা হল, যদি চাঁদ না থাকে তাহলে পৃথিবীতে দিন ২৪ ঘণ্টার পরিবর্তে মাত্র ছয় ঘন্টার হত।
তবে চাঁদের সবচেয়ে ভয়ংকর একটি ইতিহাস হল, যুক্তরাষ্ট্র একবার চাঁদের উপর পারমানবিক বোমার বিস্ফোরণের কথা চিন্তা করেছিল। উদ্দেশ্য ছিল এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি প্রদর্শন করা। বিশেষ করে রাশিয়াকে ভয় দেখানো। যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার অত্যন্ত গোপনীয় এই পরিকল্পনার নাম ছিল 'এ স্টাডি অফ লুনার রিসার্চ ফ্লাইটস' অথবা 'প্রজেক্ট এ১১৯।' আর এই প্রোজেক্ট যদি সত্যিই বাস্তবায়ন হত তাহলে পৃথিবীর এক বিশাল পরিবর্তন হয়ে যেত। আর এতদিনে হয়ত আমরা কেউ বেঁচেও থাকতাম না। কারন পৃথিবীর বেঁচে থাকার জন্য এই চাঁদ অনেক ভুমিকা পালন করে থাকে।
0 মন্তব্যসমূহ