বাঙ্গালী মানেই মাছ। তবে মাছ বাজারে গেলে চোখে পড়বে অজস্র আঁশ। আর মাছের আঁশ বলতে আমরা সাধারণত মাছের উচ্ছিষ্ট অংশ বুঝে থাকি, যা আমরা dustbin এ ফেলে দিয়ে থাকি। কিন্তু এই আঁশ নিয়ে বিজ্ঞানীরা নানা বিধ গবেষণা করছেন ও উন্নত দেশে কাজে লাগছে এই আঁশ, যার সম্পর্কে আমরা অনেকেই অজ্ঞাত। মাছের আঁশের কিছু আশ্চর্য করা ব্যবহার নিয়েই আজকের এই লেখা।
মাছের আঁশ থেকে উপকরণ তৈরি বহু প্রাচীন একটি পদ্ধতি। আমাদের আগে বহু মানুষ, বহু শতাব্দী ধরে, সুন্দর সুন্দর জিনিস তৈরি করতে মাছের আঁশ ব্যবহার করে আসছে।
বর্তমানে, থাইল্যান্ডের ফুকেট সিটিতে মাছের আঁশের বিভিন্ন অলংকরন তৈরি করে বিক্রি করেন ওখানকার মহিলারা। এছাড়া চীন, সিঙ্গাপুর সহ বিভিন্ন দেশে বহুল প্রচলিত হচ্ছে মাছের আঁশের উপকরণ। আজকাল অনলাইনেও মাছের আঁশের বিভিন্ন উপকরণ পাওয়া যাচ্ছে।
আপনি জানলে অবাক হবেন, এই আঁশ ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে বিভিন্ন উন্নত দেশ। মাছের আঁশের একটি গাঠনিক উপাদান হলো কোলাজেন ফাইবার, এর উপর যখন কোনো প্রকার বাহ্যিক চাপ বা শক্তি প্রয়োগ করা হয় তখন এর থেকে বৈদ্যুতিক চার্জ উত্পন্ন হয়। চীন ও জাপানে এই আঁশ ব্যবহার করে এক ধরনের ন্যানোজেনারেটর তৈরি করছে যেগুলো দ্বারা রিচার্জেবল ব্যাটারিতে চার্জ দেয়া যায়। তাছাড়া ঘরোয়া বিদ্যুত্ উত্পাদনেও ব্যবহূত হয়ে থাকে এই বিশেষ ধরনের ন্যানোজেনারেটর।
মাছের আঁশে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ কিছু অ্যামাইনো এসিড যার কারনে মাছের আঁশের পাউডার বিভিন্ন দেশে স্যুপের সাথে পুষ্টি প্রদায়ক উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তাছাড়া Collagen সমৃদ্ধ হওয়াতে কৃত্রিম কর্ণিয়া ও কৃত্রিম হাড় তৈরিতেও ব্যবহৃত হয় মাছের আঁশ। Degenerative joint disorder রোগের প্রতিকারক হিসেবেও মাছের আঁশ ব্যবহার করা হয়। বিশেষ কিছু মাছের আঁশ (যেমন – তেলাপিয়া) মানুষের পুড়ে যাওয়া অংশে চামড়া প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে ব্যবহারের জন্য গবেষণা চলমান রয়েছে। এছাড়া মাছের আঁশ দিয়ে তৈরি হচ্ছে ক্যাপসুলের মোড়ক।
মহিলাদের সাধের প্রসাধনী লিপস্টিক ও নেইল পলিশের একটি অত্যাবশ্যক উপাদান হলো মাছের আঁশ থেকে আহরিত Guanine যৌগ। এই Guanine ব্যবহারের ফলে এই ধরণের প্রসাধনীর উজ্জ্বল ভাব ও স্থায়ীত্ব বজায় থাকে। তাছাড়া মেকআপ ও ব্লাশ তৈরিতেও ব্যবহার হয় মাছের আঁশ থেকে আহরিত Guanine যৌগ। বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর বিশাল পরিমাণ মাছের আঁশ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা হয়।
ঘর সাজাতেও কাজে লাগে মাছের আঁশ। এই আঁশ থেকে ঘরে বসেই নানাবিধ জিনিস তৈরি করা যায়। মাছের আঁশের ফুলদানী , গলার অলংকার হার, নেকলেস, মাছের আঁশের দুল , আংটি, ব্রেসলেট বা কাঁকন, কৃত্রিম নখ, চুলের ফিতা ও আংটা ইত্যাদি সাজানোর উপকরণ তৈরি করা হয়।
পরিবেশ দূষণের মধ্যে বিশেষত পানি দূষণের জন্য দায়ী একটি কারণ হলো “Heavy metal pollution”। সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা গবেষণার মাধ্যমে মত দিয়েছেন যে “Heavy metal pollution” রোধে মাছের আঁশ খুবই কার্যকরী। মাছের আঁশের রয়েছে “Bio-absorbance capacity” যার কারণে বিভিন্ন Heavy-metal যেমনঃ কপার, সীসা ইত্যাদির দূষণ রোধ করতে মাছের আঁশ থেকে তৈরি পাউডার খুবই কার্যকরী, পরিবেশবান্ধব, ও অর্থসাশ্রয়ী।
বাংলাদেশ থেকে মাছের আঁশ সাধারণত চীনে রফতানি করা হয়। প্রক্রিয়াজাতকালে ৫০ শতাংশ প্রক্রিয়াজাতকরণ ক্ষতি হওয়া সত্ত্বেও বর্তমানে প্রতি কেজি মাছের আঁশ আন্তর্জাতিক বাজারে প্রায় ১.৯ থেকে ২ ডলারে রফতানি হচ্ছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে মাছের আঁশের রফতানি মূল্য ছিল ৩৪ লাখ ৭৬ হাজার ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ ৩০ কোটি টাকা।
আঁশের নির্যাস থেকে তৈরি হচ্ছে মুক্তা। তবে এখনো টেকসই প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণ সম্ভব হয়নি আমাদের দেশে। বাংলাদেশের এক পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, কৃত্রিম মুক্তা উত্পাদন সম্ভব হলে বছরে ১৫০০ কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। এছাড়া ২০ থেকে ৩০ লাখ লোকের এ শিল্পে কর্মসংস্থানের সুযোগ হতে পারে। হেরিং ফিশ, রিবন ফিশ ইত্যাদি মাছের আঁশ থেকে বেশি নির্যাস পাওয়া যায়। এসব মাছ ছাড়াও অন্যান্য আঁশযুক্ত রূপালী মাছের আঁশ হতেও মুক্তার নির্যাস প্রস্তুত করা হয়। কিন্তু হেরিং ও রিবন ফিশের স্কেইল হতে যতটুকু নির্যাস পাওয়া যায় তা অন্যান্য মাছ হতে পাওয়া যায় না। রিবন ফিশ আমাদের বঙ্গোপসাগর এলাকায় প্রচুর পাওয়া যায়। যার কারণে অদূর ভবিষ্যতে আমাদের কৃত্রিম মুক্তা চাষের উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়াও মাছের আঁশ থেকে আঠা এবং খেলনা সামগ্রী তৈরি করে কুটির শিল্পে লাভবান হওয়া সম্ভব। জমিতে সার হিসেবে মাছের আঁশ ব্যবহার করা হয়। হাঁস মুরগির খাবারে মাছের আঁশ ছোট ছোট টুকরো করে কেটে দেওয়া যায়। মাছের আঁশ যেখানে-সেখানে ফেলে দিলে দূষণ হতে পারে। কিন্তু সঠিকভাবে মাছের আঁশ প্রক্রিয়াজাতের মাধ্যমে আমরা সাবলম্বী হতে পারি।
আমদের প্রতিনিয়ত ফেলে দেওয়া মাছের আঁশের এতরকমের ব্যবহার সত্যিই অবাক করা। আমাদের চোখে যা বর্জ্য তা অন্যান্য অনেক ক্ষেত্রে খুবই মূল্যবান ও গুরুত্বপূর্ণ।
0 মন্তব্যসমূহ